বন্ধুরা, ভ্রমণ মানেই নতুন কিছু দেখা, শেখা আর মনে করে রাখার জন্য কিছু স্মৃতি সঙ্গে করে নিয়ে আসা, তাই না? তিউনিসিয়ার মতো এক অপূর্ব দেশে গেলে মন চায় যেন সেখানকার প্রতিটি মুহূর্তকে সাথে করে নিয়ে আসি!
সেখানকার রঙিন বাজার, সুপ্রাচীন সংস্কৃতি আর মন ভোলানো কারুশিল্প দেখলে কোনটা রেখে কোনটা কিনবেন, তা নিয়ে একটু ভাবনায় পড়তে হয় বৈকি।আমি যখন প্রথম তিউনিসিয়াতে গিয়েছিলাম, আমারও একই দশা হয়েছিল। কিন্তু অনেক ঘুরে ঘুরে আর সেখানকার স্থানীয়দের সাথে কথা বলে আমি কিছু অসাধারণ রত্ন খুঁজে পেয়েছি, যা আপনার ভ্রমণকে আরও অর্থপূর্ণ করে তুলবে এবং প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটাবে। আপনার কেনাকাটার অভিজ্ঞতা আরও আনন্দময় করতে কিছু বিশেষ টিপসও আছে আমার কাছে। আমি নিশ্চিত, আজকের এই আলোচনা আপনার তিউনিসিয়া ভ্রমণ এবং কেনাকাটাকে আরও সহজ করে তুলবে। তাহলে আর দেরি না করে চলুন, বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক!
তিউনিসিয়ার হাতের কাজ: ঐতিহ্যের পরশ

আমি যখন তিউনিসিয়ার সরু গলিগুলোতে হাঁটছিলাম, তখন প্রতিটি দোকানেই হাতের কাজের এক অপূর্ব সম্ভার দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এখানকার কারুশিল্পীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁদের দক্ষতা ধরে রেখেছেন, যা প্রতিটি জিনিসের মধ্যেই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। মনে আছে, একবার সেখানকার একটি ছোট দোকানে একটি হস্তনির্মিত কাঠের বাক্স দেখেছিলাম, যার ওপর জটিল নকশা খোদাই করা ছিল। সেগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্রতিটি নকশাই তিউনিসিয়ার কোনো প্রাচীন গল্প বলছে। আপনি যদি আপনার প্রিয়জনদের জন্য এমন কিছু খুঁজতে চান যা তিউনিসিয়ার আত্মা বহন করে, তবে এখানকার হাতের কাজের জিনিসপত্র আপনার মন জয় করবেই। আমি নিজে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে বিভিন্ন কারিগরের কাজ দেখছিলাম, তাদের হাতের যাদুতে মাটি, কাঠ আর ধাতু যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠছিল। এই জিনিসগুলো শুধু স্যুভেনিয়ার নয়, বরং তিউনিসিয়ার সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এগুলো যখন আপনার বাড়িতে থাকবে, তখন তা কেবল একটি সাজানোর জিনিস হয়ে থাকবে না, বরং আপনাকে বারবার তিউনিসিয়ার সেই রঙিন স্মৃতিগুলো মনে করিয়ে দেবে। সেখানকার কারিগরদের সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছিল, তারা প্রতিটি জিনিসের সাথে যেন নিজেদের ভালোবাসা আর পরিশ্রম মিশিয়ে দিচ্ছেন। এই হাতের কাজের জিনিসগুলো যখন আপনি কিনবেন, তখন আপনি শুধু একটি জিনিস কিনছেন না, বরং একটি প্রাচীন ঐতিহ্যকে সমর্থন করছেন। এই অভিজ্ঞতা সত্যিই অতুলনীয় ছিল, যা আমাকে অনেক বেশি আনন্দ দিয়েছিল।
ঐতিহ্যবাহী কাঠের খোদাই
তিউনিসিয়ার কাঠের কাজগুলো সত্যিই এক দেখার মতো জিনিস! এখানকার কারিগররা বিভিন্ন ধরনের কাঠ ব্যবহার করে এমন সব সুন্দর জিনিস তৈরি করেন, যা আপনাকে মুগ্ধ করবে। ছোট জুয়েলারি বাক্স থেকে শুরু করে বড় বড় সিন্দুক পর্যন্ত, প্রতিটি জিনিসই হাতে খোদাই করা জটিল নকশার কারণে শিল্পকর্মের মতো দেখায়। আমার মনে আছে, একবার একটি বাদামী রঙের বাক্স দেখেছিলাম যার ওপরের নকশাগুলো এতই সূক্ষ্ম ছিল যে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো গল্প বলা হচ্ছে। এই ধরনের জিনিসপত্র ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে দারুণ কার্যকর। আমি একটি ছোট বাক্স কিনে এনেছিলাম আমার নিজের ব্যবহারের জন্য, আর এখনও সেটির সৌন্দর্য আমাকে প্রতিদিন মুগ্ধ করে।
ধাতব কারুশিল্প ও রূপালী গহনা
তিউনিসিয়ার বাজারে ঘুরলে আপনি অসংখ্য ঝকঝকে ধাতব কারুশিল্প দেখতে পাবেন। ব্রোঞ্জ, তামা আর রুপার তৈরি জিনিসপত্র, যেমন লণ্ঠন, ট্রে, গহনা—এগুলো দেখলে চোখ ফেরানো দায়। বিশেষ করে রূপার গহনাগুলো এখানকার মহিলাদের মধ্যে খুব জনপ্রিয়। হাতে খোদাই করা নকশা আর তাতে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী মোটিফের ব্যবহার এই গহনাগুলোকে সত্যিই অসাধারণ করে তোলে। আমি আমার বোনের জন্য একটি রূপার নেকলেস কিনেছিলাম, যার নকশা ছিল একেবারেই অন্যরকম। সে এটা পেয়ে এতটাই খুশি হয়েছিল যে তার হাসি দেখে আমারও খুব ভালো লেগেছিল। এগুলোর মানও খুবই ভালো হয়, তাই এগুলো বহু বছর ধরে ব্যবহার করা যায়।
রঙিন সিরামিক ও মৃৎশিল্প: গৃহসজ্জার নতুন ঠিকানা
তিউনিসিয়ার সিরামিক আর মৃৎশিল্পের কথা কি আর বলবো! এখানকার প্রতিটি থালা, বাটি আর মাটির পাত্র যেন এক একটি রঙিন ক্যানভাস। আমি যখন প্রথম সিরামিকের দোকানগুলোতে ঢুকলাম, মনে হচ্ছিল যেন রঙের সমুদ্রে ডুবে গেছি। উজ্জ্বল নীল, সবুজ, হলুদ আর লাল রঙের সংমিশ্রণে তৈরি এসব সিরামিকের নকশা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। বিশেষ করে নাবেল (Nabeul) শহরের সিরামিকের সুনাম বিশ্বজোড়া। এখানকার সিরামিকগুলোতে যে ফিনিশিং আর সূক্ষ্মতা দেখা যায়, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। আমি নিজে রান্নাঘরের জন্য কিছু সিরামিকের প্লেট আর বাটি কিনেছিলাম, যেগুলো এখন আমার ডাইনিং টেবিলের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন যখন সেগুলোতে খাবার পরিবেশন করি, তখন তিউনিসিয়ার সেই রোদ ঝলমলে দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। এই সিরামিকগুলো শুধুমাত্র সুন্দরই নয়, বরং খুবই মজবুত এবং টেকসই হয়। অনেকেই মনে করেন, এগুলো শুধুমাত্র সাজানোর জিনিস, কিন্তু আমি আমার দৈনন্দিন জীবনে এগুলো ব্যবহার করছি এবং এর গুণগত মান নিয়ে আমি সত্যিই সন্তুষ্ট। এগুলো আপনার খাবার পরিবেশনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে এবং অতিথিদের নজর কাড়বে নিশ্চিত। আমার তো মনে হয়, তিউনিসিয়া থেকে ফেরার সময় অন্তত কিছু সিরামিক জিনিস সাথে না আনলে আপনার কেনাকাটা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
নাবেল সিরামিকের জাদুকরী ছোঁয়া
নাবেল শহর তিউনিসিয়ার সিরামিক শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এখানকার সিরামিকগুলোতে আপনি তিউনিসিয়ার ঐতিহ্যবাহী নকশার এক অসাধারণ blend দেখতে পাবেন। ফুল, জ্যামিতিক প্যাটার্ন এবং ইসলামিক ক্যালিগ্রাফির সমন্বয়ে তৈরি প্রতিটি জিনিসই এক একটি শিল্পকর্ম। আমি যখন প্রথম নাবেলের বাজার ঘুরেছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল যেন কোনো খোলা আকাশের নিচে আর্ট গ্যালারিতে হাঁটছি। এখানকার সিরামিকের উজ্জ্বল রং এবং মসৃণ ফিনিশিং এতটাই আকর্ষণীয় যে কোনটা রেখে কোনটা কিনবো, তা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দ্বিধায় ছিলাম। শেষ পর্যন্ত, আমি কিছু ছোট বাটি আর একটি বিশাল আকারের প্লেট নিয়ে ফিরেছিলাম, যা এখনও আমার ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে চলেছে।
ঐতিহ্যবাহী মাটির পাত্র
তিউনিসিয়ার মাটির পাত্র বা মৃৎশিল্পের আবেদনই আলাদা। এখানকার স্থানীয় কারিগররা শত শত বছর ধরে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। হাতে তৈরি এসব পাত্রের মধ্যে আপনি খুঁজে পাবেন গ্রামের সহজ সরল জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। সাধারণত এগুলো প্রাকৃতিক রঙের হয়, মাঝে মাঝে হালকা নকশাও দেখা যায়। আমি একটি বড় মাটির জার কিনেছিলাম, যা এখন আমার বারান্দায় ফুল রাখার জন্য ব্যবহার করি। এগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি পরিবেশবান্ধবও বটে। এই জিনিসগুলো আপনার বাড়িতে একটি rustic আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এনে দেবে, যা অন্য কোনো আধুনিক সজ্জার সাথে তুলনা করা যায় না।
তারিখ আর মিষ্টি: স্বাদের তিউনিসিয়া
তিউনিসিয়া মানেই কিন্তু শুধু কারুশিল্প আর ঐতিহ্য নয়, এখানকার খাবারদাবারও কিন্তু বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে এখানকার তারিখ আর মিষ্টিগুলো একবার খেলে আপনি এর স্বাদ ভুলতে পারবেন না। আমি যখন প্রথমবারের মতো তিউনিসিয়ান খেজুর চেখে দেখেছিলাম, তখন এর মিষ্টি আর রসালো স্বাদ আমাকে মুগ্ধ করে দিয়েছিল। এখানকার খেজুরগুলো এতটাই তাজা আর সুস্বাদু যে মনে হয় যেন গাছের সতেজ স্বাদ সরাসরি আপনার মুখে আসছে। বিভিন্ন জাতের খেজুর পাওয়া যায় এখানে, যার মধ্যে “দেগলেট নূর” (Deglet Noor) সবচেয়ে বিখ্যাত। আমি আমার বন্ধুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খেজুর কিনেছিলাম, আর তারাও এর অসাধারণ স্বাদ পেয়ে রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিল। শুধু খেজুরই নয়, এখানকার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিগুলোও অসাধারণ। বাদাম, মধু আর নানা সুগন্ধি দিয়ে তৈরি এসব মিষ্টি মুখের মধ্যে এক অনন্য স্বাদ এনে দেয়। এই মিষ্টিগুলো আপনার প্রিয়জনদের জন্য একটি দারুণ উপহার হতে পারে, যা তাদের মুখে হাসি ফোটাবে নিশ্চিত। আমি তো ব্যক্তিগতভাবে এখানকার বাদামী পেস্ট্রিগুলোর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম, যা চা বা কফির সাথে খেতে দারুণ লাগে। তিউনিসিয়া থেকে ফেরার সময় আপনি যদি কিছু মুখে জল আনা জিনিসপত্র আনতে চান, তবে খেজুর আর এখানকার মিষ্টিগুলো আপনার তালিকার শীর্ষে রাখা উচিত। এগুলোর স্বাদ আপনাকে বারবার তিউনিসিয়ার কথা মনে করিয়ে দেবে।
রসালো খেজুরের ভুবন
তিউনিসিয়ার খেজুরের স্বাদ সত্যিই অতুলনীয়। মরুভূমির সোনালী রোদে বেড়ে ওঠা এই খেজুরগুলো এতটাই রসালো আর মিষ্টি যে একবার খেলে আপনার মন ভরে যাবে। এখানকার “দেগলেট নূর” জাতের খেজুরগুলো এতটাই বিখ্যাত যে একে “আলোর খেজুর” বলা হয়। আমি যখন স্থানীয় বাজারে গিয়েছিলাম, তখন বিভিন্ন ধরনের খেজুরের পসরা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে আমি তাজা খেজুরের প্যাকেট কিনেছিলাম, যা আজও আমার সকালের নাস্তার সঙ্গী। এটি প্রাকৃতিকভাবেই মিষ্টি, তাই স্বাস্থ্য সচেতনদের জন্যও এটি একটি দারুণ পছন্দ।
ঐতিহ্যবাহী তিউনিসিয়ান মিষ্টি
খেজুরের পাশাপাশি এখানকার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিগুলোও আপনার মন কেড়ে নেবে। বাদাম, মধু, সেমোলিনা আর গোলাপজল দিয়ে তৈরি এসব মিষ্টির স্বাদ সত্যিই অসাধারণ। “মাক্রুদ” (Makroudh) বা “বাকলাভা” (Baklava) এখানকার জনপ্রিয় মিষ্টিগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমি প্রথমবার যখন মাক্রুদ খেয়েছিলাম, তখন এর নরম আর মিষ্টি স্বাদে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। এগুলো সাধারণত গোল বা চৌকো আকারের হয় এবং মাঝে মাঝে চিনির সিরাপে ডুবানো থাকে। আপনার বন্ধুদের বা পরিবারের সদস্যদের জন্য এই মিষ্টিগুলো নিয়ে গেলে তারা নিশ্চিতভাবে দারুণ খুশি হবে।
জমকালো টেক্সটাইল ও পোশাক: তিউনিসিয়ার ফ্যাশন
তিউনিসিয়ার বস্ত্রশিল্পের কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে এখানকার দারুণ সব ফ্যাব্রিক আর পোশাকের কথা। এখানকার টেক্সটাইলগুলোতে স্থানীয় সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের এক দারুণ ফিউশন দেখা যায়। আমি যখন তিউনিসের মেডি’নার সরু রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম, তখন বিভিন্ন দোকানে ঝুলানো রঙিন টেক্সটাইলগুলো আমাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছিল। হাতে বোনা স্কার্ফ, শাল আর গালিচাগুলো এতটাই দৃষ্টিনন্দন যে একবার দেখলে চোখ ফেরানো দায়। বিশেষ করে এখানকার হাতে এমব্রয়ডারি করা পোশাকগুলো আমাকে খুব আকর্ষণ করেছিল। এই পোশাকগুলোতে যে সূক্ষ্ম কাজ দেখা যায়, তা সত্যিই একজন কারিগরের দিনের পর দিন পরিশ্রমের ফল। এখানকার ফ্যাব্রিকগুলো সাধারণত সুতির বা লিনেন কাপড়ের হয়, যা গরম আবহাওয়ার জন্য খুবই আরামদায়ক। আমি আমার মায়ের জন্য একটি হাতে বোনা শাল কিনেছিলাম, যার নকশা ছিল একেবারেই ইউনিক। তিনি এটি পেয়ে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে আমারও খুব ভালো লেগেছিল। তিউনিসিয়ার টেক্সটাইলগুলো শুধুমাত্র আরামদায়কই নয়, বরং আপনার ফ্যাশনে একটি বিশেষ ছোঁয়া এনে দেবে। আপনি চাইলে এখানকার ঐতিহ্যবাহী পোশাক, যেমন “জাব্বা” (Jebba) বা “ফুতাহ” (Fouta) কিনে দেখতে পারেন। এগুলো দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্যও বেশ আরামদায়ক। এখানকার ফ্যাশন শুধু কাপড়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি গল্প বলে, যা সেখানকার ইতিহাস আর সংস্কৃতিকে তুলে ধরে।
হাতে বোনা শাল ও স্কার্ফ
তিউনিসিয়ার হাতে বোনা শাল আর স্কার্ফগুলো খুবই জনপ্রিয়। এখানকার তাঁতিরা সুতি, উল বা লিনেন কাপড় ব্যবহার করে সুন্দর নকশার শাল তৈরি করেন। এই শালগুলো শুধু ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাতেই নয়, বরং আপনার পোশাকের সাথে স্টাইলিশ এক লুক এনে দিতেও সাহায্য করে। আমি যখন একটি দোকানে একটি লাল-নীল রঙের শাল দেখেছিলাম, তখন এর রঙের বুনন আর নকশার গভীরতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এগুলো হালকা হওয়ায় সহজে ব্যাগে বহন করা যায় এবং উপহার হিসেবেও এটি একটি দারুণ পছন্দ।
ঐতিহ্যবাহী পোশাক: জাব্বা ও ফুতাহ
তিউনিসিয়ার ঐতিহ্যবাহী পোশাকগুলোর মধ্যে জাব্বা (Jebba) এবং ফুতাহ (Fouta) বেশ পরিচিত। জাব্বা হলো ঢিলেঢালা, আরামদায়ক লম্বা পোশাক, যা পুরুষ ও মহিলা উভয়েই পরেন। আর ফুতাহ হলো এক ধরনের সুতির বা লিনেনের কাপড়, যা তোয়ালে বা পোশাক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে হাম্মাম বা সমুদ্র সৈকতে। আমি নিজের জন্য একটি ফুতাহ কিনেছিলাম, যা এখন আমার স্নানের পর ব্যবহার করি। এটি এতটাই নরম আর আরামদায়ক যে আপনি একবার ব্যবহার করলে এর প্রেমে পড়ে যাবেন। এগুলো বিভিন্ন রঙ ও ডিজাইনে পাওয়া যায়, তাই নিজের পছন্দমতো বেছে নেওয়া আপনার জন্য কঠিন হবে না।
অলিভ অয়েল ও মশলা: রন্ধনশালার সম্পদ

তিউনিসিয়ার কথা ভাবলে আমার মনে শুধু সেখানকার কারুশিল্পের কথাই আসে না, বরং এখানকার অলিভ অয়েল আর সুগন্ধি মশলার কথাও মনে পড়ে। তিউনিসিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অলিভ অয়েল উৎপাদক দেশ, আর এখানকার অলিভ অয়েলের মান সত্যিই অসাধারণ। আমি যখন স্থানীয় একটি বাজার থেকে তাজা অলিভ অয়েল কিনেছিলাম, তখন এর সুগন্ধ আর স্বাদ আমাকে মুগ্ধ করে দিয়েছিল। এটি শুধু রান্নায় স্বাদই বাড়ায় না, বরং স্বাস্থ্যের জন্যও খুব উপকারী। আমার মনে আছে, সেখানকার স্থানীয় একজন দোকানি আমাকে বলেছিলেন যে তিউনিসিয়ার জলবায়ু অলিভ গাছের বৃদ্ধির জন্য খুব ভালো, তাই এখানকার তেল এত খাঁটি হয়। শুধু অলিভ অয়েলই নয়, এখানকার বিভিন্ন ধরনের মশলাও আপনার রান্নাঘরের জন্য এক দারুণ সংযোজন হতে পারে। বিশেষ করে “হারিসা” (Harissa) নামক এক ধরনের ঝাল পেস্ট এখানকার খাবারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি ব্যক্তিগতভাবে হারিসার স্বাদের এতটাই ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে কয়েকটি জার কিনে নিয়ে এসেছি। এখানকার মশলাগুলো এতটাই তাজা আর সুগন্ধি যে সেগুলো আপনার সাধারণ রান্নাকেও অসাধারণ করে তুলবে। আপনি যদি একজন ভোজনরসিক হন এবং রান্না করতে ভালোবাসেন, তবে তিউনিসিয়া থেকে ফেরার সময় এখানকার অলিভ অয়েল আর বিভিন্ন মশলা নিয়ে আসা আপনার জন্য একটি দারুণ সিদ্ধান্ত হবে। এগুলো আপনার রান্নাঘরের স্বাদকে নতুন মাত্রা দেবে।
খাঁটি তিউনিসিয়ান অলিভ অয়েল
তিউনিসিয়ার অলিভ অয়েল বিশ্বজুড়ে পরিচিত এর অসাধারণ গুণগত মানের জন্য। এখানকার তেল এতটাই খাঁটি যে আপনি এর স্বাদ আর সুগন্ধের মধ্যে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাবেন। আমি যখন একটি ছোট বোতলে সেখানকার স্থানীয় তেল কিনে এনেছিলাম, তখন এটি ব্যবহার করে আমার খাবারের স্বাদ আরও বেড়ে গিয়েছিল। এটি শুধু রান্নার জন্যই নয়, সালাদে বা রুটির সাথে ডুবিয়ে খেতেও দারুণ লাগে। স্বাস্থ্য সচেতনদের জন্য এটি একটি দারুণ উপহার হতে পারে।
সুগন্ধি মশলা ও হারিসা
তিউনিসিয়ার বাজারগুলোতে আপনি বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি মশলার পসরা দেখতে পাবেন। জিরা, ধনে, হলুদ এবং আরও অনেক ধরনের মশলা এখানে খুব তাজা অবস্থায় পাওয়া যায়। কিন্তু এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় মশলা হলো “হারিসা”, যা এক ধরনের ঝাল পেস্ট। এটি শুকনো মরিচ, রসুন, ধনে আর জিরা দিয়ে তৈরি হয়। আমি নিজে হারিসার ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম এবং বিভিন্ন খাবারের সাথে এটি ব্যবহার করে থাকি। এটি আপনার খাবারে একটি দারুণ ঝাল এবং সুগন্ধ এনে দেবে।
প্রাচীন রূপালী গহনা: ঐতিহ্যের ছোঁয়া
তিউনিসিয়ার গহনাগুলোর মধ্যে রূপালী গহনাগুলো সত্যিই আমার মন কেড়েছিল। এখানকার কারিগররা প্রাচীন বার্বার ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটিয়ে এমন সব গহনা তৈরি করেন, যা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। আমি যখন মেডি’নার গহনার দোকানগুলোতে ঢুকলাম, তখন সেখানকার রূপালী গহনাগুলোর চমক আর সূক্ষ্ম কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন প্রতিটি গহনার পেছনেই একটি গল্প লুকিয়ে আছে। এখানকার গহনাগুলোতে সাধারণত স্থানীয় নকশা, পাথর আর রঙিন কাঁচের ব্যবহার দেখা যায়, যা সেগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। আমার মনে আছে, আমি আমার জন্য একটি হাতে তৈরি রূপার ব্রেসলেট কিনেছিলাম, যা আমার প্রতিদিনের পোশাকের সাথে খুব ভালোভাবে মানিয়ে যায়। এই গহনাগুলো শুধু একটি ফ্যাশন স্টেটমেন্ট নয়, বরং তিউনিসিয়ার ইতিহাস আর সংস্কৃতির একটি ছোট অংশ। আপনি যদি এমন কিছু কিনতে চান যা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং যার একটি সাংস্কৃতিক মূল্য থাকবে, তবে এখানকার রূপালী গহনাগুলো আপনার জন্য একটি দারুণ পছন্দ হতে পারে। আমি নিজে এখানকার একটি ছোট দোকানে বসে এক কারিগরের গহনা তৈরির প্রক্রিয়া দেখেছিলাম, যেখানে তিনি কতটা যত্ন আর মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি জিনিস তৈরি করছিলেন। তার হাতের প্রতিটি ছোঁয়ায় যেন শিল্পের ছোঁয়া লেগেছিল। এই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও মুগ্ধ করেছিল। এই গহনাগুলো শুধু আপনার সৌন্দর্যই বাড়াবে না, বরং আপনাকে তিউনিসিয়ার এক ভিন্ন জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে।
বার্বার নকশার রূপালী গহনা
তিউনিসিয়ার রূপালী গহনাগুলোর মধ্যে বার্বার নকশার প্রভাব খুব স্পষ্ট। বার্বার উপজাতিদের ঐতিহ্যবাহী নকশা আর মোটিফ ব্যবহার করে তৈরি এসব গহনা সত্যিই অনন্য। হার, কানের দুল, ব্রেসলেট আর আংটি—সবকিছুতেই আপনি খুঁজে পাবেন প্রাচীন সংস্কৃতির ছোঁয়া। আমি যখন একটি দোকানে বার্বার নকশার একটি রূপার কানের দুল দেখেছিলাম, তখন এর ডিজাইন দেখে অবাক হয়েছিলাম। এগুলোর প্রতিটিই হাতে তৈরি এবং অত্যন্ত যত্ন সহকারে ফিনিশিং করা হয়।
অমূল্য পাথরের সমন্বয়
রূপালী গহনার পাশাপাশি, অনেক গহনাতে মূল্যবান বা অর্ধ-মূল্যবান পাথরের ব্যবহারও দেখা যায়। ফিরোজা, কোরাল আর অ্যাম্বার পাথরের ব্যবহার এখানকার গহনাগুলোকে আরও জমকালো করে তোলে। এই পাথরগুলো গহনার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং একে একটি বিশেষ আবেদন দেয়। আমি একটি রূপার রিং কিনেছিলাম, যেখানে একটি ছোট ফিরোজা পাথর বসানো ছিল। এটি দেখতে খুবই সুন্দর এবং এর সাথে তিউনিসিয়ার এক টুকরো স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
| স্মারকের প্রকার | বর্ণনা | কোথায় পাওয়া যাবে |
|---|---|---|
| সিরামিক | হাতে আঁকা রঙিন থালা, বাটি, জার। নাবেল শহর এর জন্য বিখ্যাত। | সুক (Souk), নাবেল, সিদি বু সাইদ |
| তারিখ | বিভিন্ন প্রজাতির মিষ্টি ও রসালো খেজুর, বিশেষ করে “দেগলেট নূর”। | স্থানীয় বাজার, সুপারমার্কেট, যেকোনো বড় শহরের দোকান |
| রূপালী গহনা | বার্বার নকশার ঐতিহ্যবাহী হাতে তৈরি হার, ব্রেসলেট, কানের দুল। | মেডি’নার গহনার দোকান, আর্টিসানাল সেন্টার |
| অলিভ অয়েল | খাঁটি এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, রান্নার জন্য বা সালাদে ব্যবহারের জন্য। | স্থানীয় বাজার, অলিভ অয়েল স্টোর, সুপারমার্কেট |
বার্বার কার্পেট: গল্প বোনা প্রতিটি সুতোয়
তিউনিসিয়ার হস্তশিল্পের কথা বললে বার্বার কার্পেটের কথা না বললেই নয়। এখানকার কার্পেটগুলো শুধু মেঝেতে পাতার জিনিস নয়, বরং প্রতিটি কার্পেটের মধ্যেই যেন তিউনিসিয়ার সংস্কৃতি আর বার্বার উপজাতিদের জীবনযাত্রার গল্প বোনা আছে। আমি যখন প্রথম একটি কার্পেটের দোকানে ঢুকেছিলাম, তখন এত ধরনের নকশা আর রঙের সমারোহ দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এখানকার কার্পেটগুলো সাধারণত হাতে বোনা হয় এবং এর প্রতিটি সুতোয় থাকে কারিগরের ভালোবাসা আর পরিশ্রমের ছোঁয়া। এগুলোর নকশাগুলো খুবই জ্যামিতিক এবং প্রতীকী, যা বার্বারদের প্রাচীন বিশ্বাস আর প্রকৃতিকে তুলে ধরে। মনে আছে, আমি একটি ছোট কার্পেট কিনে এনেছিলাম আমার বসার ঘরের জন্য, যার রঙ আর নকশা আমার ঘরের সৌন্দর্যকে অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। এই কার্পেটগুলো আপনার ঘরের সজ্জায় একটি বিশেষ ঐতিহ্যবাহী ছোঁয়া এনে দেবে। এগুলোর স্থায়িত্বও খুব ভালো হয়, তাই বহু বছর ধরে এগুলো ব্যবহার করা যায়। আমি স্থানীয় একজন কারিগরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই কার্পেটগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে, আর তিনি আমাকে বলেছিলেন যে প্রতিটি নকশারই নাকি একটি নিজস্ব অর্থ আছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। এই কার্পেটগুলো আপনার বাড়িতে শুধু একটি সুন্দর জিনিস হিসেবে থাকবে না, বরং তিউনিসিয়ার এক টুকরো ঐতিহ্যকে আপনার সাথে নিয়ে আসবে। এটি একটি দারুণ বিনিয়োগ হতে পারে, যা আপনার ঘরকে উষ্ণতা আর সৌন্দর্য উভয়ই দেবে।
হাতে বোনা বার্বার কার্পেটের বিশেষত্ব
বার্বার কার্পেটগুলো তাদের অনন্য নকশা আর রঙের জন্য বিখ্যাত। সাধারণত এগুলো উল বা তুলা দিয়ে হাতে বোনা হয় এবং এদের নকশাগুলো জ্যামিতিক, প্রতীকী এবং প্রায়শই উপজাতীয় গল্প বা বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে। আমি একটি কার্পেট দেখেছিলাম যার নকশায় উটের ছবি ছিল, যা মরুভূমির জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। এই কার্পেটগুলো খুবই মজবুত হয় এবং বহু বছর ধরে ব্যবহার করা যায়।
কার্পেট নির্বাচনের টিপস
একটি ভালো বার্বার কার্পেট কেনার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা উচিত। প্রথমে, কার্পেটের ঘনত্ব পরীক্ষা করুন—যত ঘন হবে, তত ভালো। দ্বিতীয়ত, রং এবং নকশার প্রতি মনোযোগ দিন, যেন এটি আপনার ঘরের সজ্জার সাথে মানানসই হয়। সবশেষে, কার্পেটের উপাদান সম্পর্কে জেনে নিন, তা উল নাকি তুলা। আমি আমার কার্পেট কেনার সময় একজন অভিজ্ঞ বিক্রেতার সাহায্য নিয়েছিলাম, যিনি আমাকে এই বিষয়গুলো বুঝতে সাহায্য করেছিলেন।
লেখাটি শেষ করছি
বন্ধুরা, তিউনিসিয়ার এই অসাধারণ কেনাকাটার অভিজ্ঞতা আপনাদের কেমন লাগলো? আমার বিশ্বাস, আজকের এই আলোচনা আপনাদের তিউনিসিয়া ভ্রমণকে আরও আনন্দময় করে তুলবে এবং সেখানকার প্রতিটি কেনাকাটার পেছনে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো জানতে সাহায্য করবে। সেখানকার হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার, আর ঐতিহ্যবাহী পোশাক—প্রতিটি জিনিসই যেন তিউনিসিয়ার আত্মা বহন করে। আমি যখন এসব জিনিস নিয়ে আমার বাড়িতে ফিরেছিলাম, তখন প্রতিটি স্মারকই আমাকে সেখানকার রঙিন বাজার, উষ্ণ মানুষের হাসি আর সোনালী বালির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। আশা করি, আমার অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া এই টিপসগুলো আপনাদের কেনাকাটার পথকে আরও সহজ করে তুলবে। আপনারাও আপনাদের পছন্দের জিনিসগুলো খুঁজে নিয়ে আসুন, আর সাথে করে নিয়ে আসুন তিউনিসিয়ার এক টুকরো জাদু!
জেনে রাখুন কিছু কাজের কথা
১. স্থানীয় বাজারগুলোর সাথে পরিচিত হোন এবং দর কষাকষি করতে শিখুন: তিউনিসিয়ার সুক (Souk) বা স্থানীয় বাজারগুলোতে কেনাকাটা করার মজাই আলাদা। এখানে আপনি বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প, সিরামিক, মশলা আর পোশাকের দোকান খুঁজে পাবেন। মনে রাখবেন, এসব বাজারে দর কষাকষি করাটা কিন্তু খুব সাধারণ একটা বিষয়! আমি যখন প্রথম দিকে গিয়েছিলাম, তখন একটু ইতস্তত করতাম, কিন্তু পরে বুঝেছিলাম যে এটি সেখানকার সংস্কৃতিরই অংশ। বিক্রেতারাও এটি উপভোগ করেন। আপনি যখন কোনো কিছু কিনতে যাবেন, তখন দাম জিজ্ঞেস করার পর তার থেকে কিছুটা কম দাম বলুন এবং ধীরে ধীরে একটি মধ্যম দামে আসুন। এতে আপনি ভালো জিনিস তুলনামূলক কম দামে পাবেন এবং কেনাকাটার অভিজ্ঞতাও অনেক মজার হবে। এছাড়াও, স্থানীয়দের সাথে কথা বলার মাধ্যমে আপনি পণ্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারবেন এবং তাদের সংস্কৃতিকে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবেন। এখানকার অনেক বিক্রেতা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া গল্পগুলো বলতে খুব ভালোবাসেন, যা শুনে আপনারও খুব ভালো লাগবে।
২. গুণগত মান যাচাই করে কিনুন, বিশেষ করে কার্পেট এবং গহনা: তিউনিসিয়াতে হাতে তৈরি পণ্যের ছড়াছড়ি, কিন্তু সবকিছুর মান একরকম হয় না। বিশেষ করে কার্পেট এবং রূপালী গহনা কেনার সময় আপনাকে একটু সতর্ক থাকতে হবে। কার্পেট কেনার সময় এর বুননের ঘনত্ব, সুতার মান এবং রঙের স্থায়িত্ব ভালোভাবে দেখে নিন। হাতে বোনা কার্পেট সাধারণত মেশিনে তৈরি কার্পেটের চেয়ে বেশি টেকসই এবং মূল্যবান হয়। আমি একবার একটি দোকানে দেখেছিলাম, কারিগররা কীভাবে নিজেদের হাতে প্রতিটি সুতো দিয়ে নকশা বুনছেন। রূপালী গহনার ক্ষেত্রেও একই কথা। খাঁটি রুপা চেনার জন্য এর ওজন এবং ফিনিশিং লক্ষ্য করুন। অনেক সময় ছোট দোকানে আপনি এমন কারিগরদের খুঁজে পাবেন যারা আপনার সামনেই গহনা তৈরি করছেন। তাদের কাছ থেকে কিনলে আপনি পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হতে পারবেন। এটি আপনার বাড়িতে একটি সত্যিকারের তিউনিসিয়ান স্মৃতি নিয়ে আসার সুযোগ দেবে।
৩. খাদ্যদ্রব্য কেনার সময় প্যাকেটজাত পণ্য বেছে নিন: তিউনিসিয়ার খেজুর, অলিভ অয়েল আর মশলার স্বাদ ভোলার মতো নয়। তবে এই ধরনের খাদ্যদ্রব্য কেনার সময় অবশ্যই ভালো মানের প্যাকেটজাত পণ্য বেছে নেওয়া উচিত, বিশেষ করে যদি আপনি সেগুলো বিদেশে নিয়ে যেতে চান। প্যাকেটজাত পণ্যগুলো সাধারণত স্বাস্থ্যবিধি মেনে তৈরি হয় এবং এতে করে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সতেজ থাকে। আমি স্থানীয় বাজারে খোলা খেজুর আর মশলা দেখে খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম, কিন্তু বিমান ভ্রমণের সুবিধার জন্য প্যাকেট করা জিনিসই কিনেছিলাম। অলিভ অয়েল কেনার সময় ‘এক্সট্রা ভার্জিন’ (Extra Virgin) লেবেল দেখে কিনুন, কারণ এটি সর্বোচ্চ মানের তেল। অনেক দোকানে আপনি ছোট বোতলে অলিভ অয়েল কিনতে পাবেন, যা উপহার হিসেবেও দারুণ। হারিসার মতো মশলা পেস্টগুলোও ভালোভাবে সিল করা প্যাকেট বা বয়ামে কিনলে সেগুলো দীর্ঘ সময় ভালো থাকে।
৪. আর্টিসানাল সেন্টার বা সরকারি দোকান থেকে কিনলে নিশ্চিত থাকতে পারেন: আপনি যদি প্রথমবার তিউনিসিয়াতে কেনাকাটা করতে যান এবং দর কষাকষি করতে স্বচ্ছন্দ বোধ না করেন, তবে আর্টিসানাল সেন্টার (Artisanal Center) বা সরকারি হস্তশিল্পের দোকানগুলো আপনার জন্য নিরাপদ বিকল্প হতে পারে। এসব দোকানে পণ্যের দাম নির্দিষ্ট থাকে এবং গুণগত মানও সাধারণত ভালো হয়। এখানকার বিক্রেতারা পণ্যের ইতিহাস এবং তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন, যা আপনার কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। আমি নিজে কয়েকটি আর্টিসানাল সেন্টারে গিয়েছিলাম এবং সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি দাম হলেও পণ্যের মান নিয়ে নিশ্চিত থাকতে পেরেছিলাম। এছাড়াও, এই সেন্টারগুলো থেকে কেনাকাটা করলে আপনি সেখানকার স্থানীয় কারিগরদের সরাসরি সমর্থন করছেন, যা তাদের শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। অনেক সময় এসব সেন্টারে আপনি কারিগরদের কাজ করার ধরনও সরাসরি দেখতে পাবেন, যা একটি বাড়তি অভিজ্ঞতা।
৫. স্মারক কেনার আগে আপনার লাগেজ সীমা সম্পর্কে জেনে নিন: তিউনিসিয়াতে এত সুন্দর জিনিসপত্র আছে যে আপনার ব্যাগ ভরে যাওয়াটা খুব স্বাভাবিক। তাই কেনাকাটার পরিকল্পনা করার আগে আপনার বিমানের লাগেজ সীমা সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন। বিশেষ করে সিরামিক বা মাটির পাত্রের মতো ভঙ্গুর জিনিসপত্রগুলো সাবধানে প্যাক করতে হয়, যার জন্য অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হতে পারে। আমি যখন আমার কেনা সিরামিকের প্লেটগুলো প্যাক করছিলাম, তখন সেগুলো ভেঙে যাওয়ার ভয়ে অনেক বাড়তি কাপড় দিয়ে মুড়ে নিয়েছিলাম। যদি আপনার অনেক বেশি কিছু কেনার পরিকল্পনা থাকে, তবে অতিরিক্ত লাগেজ কেনার কথা ভাবতে পারেন অথবা কিছু জিনিস শিপিং করার ব্যবস্থা করতে পারেন। স্থানীয় ডাকঘর বা কুরিয়ার সার্ভিসগুলো আপনাকে এই বিষয়ে সাহায্য করতে পারে। নিজের প্রয়োজন এবং লাগেজ সীমা অনুযায়ী কেনাকাটা করলে আপনার ভ্রমণ আরও আরামদায়ক হবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো
তিউনিসিয়া ভ্রমণ কেবল নতুন জায়গা দেখাই নয়, বরং সেখানকার সংস্কৃতি, ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে অনুভব করার এক দারুণ সুযোগ। আমি যখন তিউনিসিয়ার সুকগুলোতে ঘুরে বেড়িয়েছি, তখন প্রতিটি জিনিসই যেন আমাকে সেখানকার মানুষের গল্প বলছিল। হাতে বোনা কার্পেট থেকে শুরু করে রঙিন সিরামিক, সুস্বাদু খেজুর আর খাঁটি অলিভ অয়েল—প্রতিটি স্মারকই সেখানকার জীবনের অংশ। আমি ব্যক্তিগতভাবে এখানকার রূপালী গহনা আর হাতে তৈরি কাঠের জিনিসপত্রের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম, কারণ এগুলোতে শিল্পীর ভালোবাসা আর পরিশ্রমের ছাপ সুস্পষ্ট। মনে রাখবেন, স্থানীয় বাজার থেকে কেনাকাটার সময় দর কষাকষি করাটা সেখানকার সংস্কৃতিরই অংশ, তাই এই অভিজ্ঞতাটা উপভোগ করুন। আর যদি আপনি গুণগত মান নিয়ে নিশ্চিত থাকতে চান, তবে আর্টিসানাল সেন্টারগুলো আপনার জন্য সেরা বিকল্প হতে পারে। আপনার লাগেজ সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকুন এবং এমন জিনিস কিনুন যা আপনাকে বারবার তিউনিসিয়ার সোনালী স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেবে। এই সুন্দর দেশটি থেকে ফিরে আসার সময় শুধু স্মারক নয়, সাথে করে নিয়ে আসুন সেখানকার মানুষের উষ্ণতা আর অবিস্মরণীয় সব স্মৃতি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: তিউনিসিয়া থেকে স্মৃতি হিসেবে নিয়ে আসার মতো সবচেয়ে খাঁটি আর জনপ্রিয় জিনিসগুলো কী কী?
উ: আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, তিউনিসিয়ায় কেনাকাটা এক দারুণ ব্যাপার! এখানকার ঐতিহ্যবাহী সিরামিকের জিনিসপত্র (বিশেষ করে নাব্যুল আর জেরবার), হাতে তৈরি চামড়ার সামগ্রী, জলপাই কাঠের অসাধারণ কারুকাজ করা জিনিস, আর বার্বার গয়না আপনার মন কাড়বেই। আমি নিজে নাব্যুলে গিয়ে সিরামিকের রঙিন থালা-বাসন আর মগ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, সেগুলো এখনও আমার রান্নাঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে রেখেছে। আর এখানকার মশলা, খেজুর, বা হারিসা (তিউনিসিয়ান হট সস) কিনলে আপনার বাড়ির রান্নাঘরেও তিউনিসিয়ার স্বাদ চলে আসবে। কাইরুয়ানের হাতে বোনা কার্পেটগুলোও এককথায় অসাধারণ; যদিও দাম একটু বেশি, কিন্তু এর বুনন আর মান আপনাকে মুগ্ধ করবেই। চিচিয়া, মানে এখানকার ঐতিহ্যবাহী লাল টুপি, একটা দারুণ স্যুভেনিয়ার হতে পারে!
আমি একবার একটা কিনে বন্ধুদের দিয়েছিলাম, তারা খুব পছন্দ করেছিল।
প্র: তিউনিসিয়াতে এসব জিনিস কেনার জন্য সেরা জায়গাগুলো কোথায়, যেখানে আসল জিনিস পাওয়া যায় এবং পর্যটন ফাঁদ এড়ানো যায়?
উ: আমার পরামর্শ হলো, আসল তিউনিসিয়ার স্বাদ পেতে চাইলে এখানকার ‘সুক’ বা স্থানীয় বাজারগুলোতেই যান। রাজধানী তিউনিসের প্রাচীন মেদিনার সুকগুলোতে (Medina of Tunis) আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেছি, আর সেখানকার বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জিনিস কিনেছি। সুস বা কাইরুয়ানের সুকগুলোও ঠিক একইরকম আকর্ষণীয়। তবে হ্যাঁ, দামাদামি করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে!
নাব্যুলে সিরামিকের জিনিস কেনার জন্য সরাসরি তাদের কারখানা বা বড় দোকানগুলোতে যাওয়া ভালো, তাহলে আরও ভালো মানের জিনিস পাওয়া যায়। জেরবা দ্বীপে গেলে এখানকার স্থানীয় কারুশিল্পীদের ছোট ছোট দোকানে গিয়ে দেখুন, সেখানে অনেক সময় দারুণ কিছু লুকানো রত্ন খুঁজে পাওয়া যায় যা অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন। আমি সবসময় চেষ্টা করি স্থানীয় কারিগরদের কাছ থেকে জিনিস কিনতে, এতে তাদেরও সাহায্য করা হয় আর আমিও খাঁটি জিনিস পাই। পর্যটকদের জন্য তৈরি দোকানগুলো অনেক সময় মানহীন জিনিস বেশি দামে বিক্রি করে, সেগুলো একটু এড়িয়ে চলতে পারলে ভালো হয়।
প্র: তিউনিসিয়াতে কেনাকাটার সময় দর কষাকষি করার বা ভালো চুক্তি পাওয়ার জন্য আপনার কিছু বিশেষ টিপস কী কী?
উ: দর কষাকষি বা বারগেইন করাটা তিউনিসিয়ান সংস্কৃতিরই একটা অংশ, তাই লজ্জা না পেয়ে অবশ্যই দর কষাকষি করুন! আমার অভিজ্ঞতা বলে, বিক্রেতারা প্রায়শই প্রথমে যে দাম বলেন, সেটা আসল দামের চেয়ে অনেক বেশি হয়। আমি সাধারণত অর্ধেক দাম থেকে শুরু করি এবং আস্তে আস্তে একটা সহনীয় দামে পৌঁছানোর চেষ্টা করি। হাসিমুখে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করলে বিক্রেতারাও খুশি হন এবং ভালো ডিল দিতে চান। একবার আমি একটা চামড়ার ব্যাগ খুব পছন্দ করেছিলাম, কিন্তু বিক্রেতা অনেক বেশি দাম চাচ্ছিলেন। আমি একটু মন খারাপের ভান করে চলে যাচ্ছিলাম, তখনই তিনি আমাকে আবার ডেকে ভালো একটা অফার দিয়েছিলেন!
এই কৌশলটা অনেক সময় কাজ করে। স্থানীয় মুদ্রা, অর্থাৎ তিউনিসিয়ান দিনারে মূল্য পরিশোধ করলে ভালো হয়। সকালের দিকে বা সন্ধ্যার একদম শেষ ভাগে কেনাকাটা করলে ভালো ডিল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, কারণ দিনের শুরুতে বা শেষে বিক্রেতারা প্রথম বা শেষ গ্রাহকের জন্য ভালো ডিল দিতে পছন্দ করেন। আর যদি কোনো একটা দোকান থেকে অনেকগুলো জিনিস কেনেন, তাহলে একসাথে দাম কমানোর সুযোগ পাবেনই পাবেন!






